লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থানা-সংলগ্ন কয়েকটি কম্পিউটার দোকানকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ও অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য ফাঁস, সাংবাদিক পরিচয়ে ভিডিও ধারণ এবং কথিত দালালচক্রের তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, থানায় অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র লেখানোর পরপরই অচেনা নম্বর থেকে ফোন করে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কেউ নিজেদের পুলিশের পরিচিত ব্যক্তি, কেউ আদালতের মুহুরি, কেউ থানার লোক আবার কেউ সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। এমনকি অভিযোগকারী ও বিবাদী উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মধ্যস্থতার নামে অর্থ দাবি এবং আদালতে মামলা করার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, থানায় অভিযোগের বিষয়টি সীমিত পরিসরে জানানো হলেও অভিযোগ লেখানোর পরপরই বাইরের লোকজন কীভাবে তাদের মোবাইল নম্বর ও অভিযোগের বিস্তারিত তথ্য জানতে পারছেন?
অভিযোগ রয়েছে, থানার সামনে থাকা কয়েকটি কম্পিউটার দোকানে কিছু ব্যক্তি নিজেদের সাংবাদিক বা সাংবাদিকদের স্টাফ পরিচয় দিয়ে অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলেন। কখনো মামলা করে দেওয়ার আশ্বাস, আবার কখনো পুলিশের মাধ্যমে কাজ করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।
এ ছাড়া কয়েকজন ভুক্তভোগীর অভিযোগ, দোকানে অভিযোগ বা মামলা-সংক্রান্ত কাগজপত্র তৈরি করতে গেলে সেখানে থাকা কিছু আইনজীবীর মুহুরি তাদের থানায় অভিযোগ না করে আদালতে মামলা করার পরামর্শ দেন। এ নিয়ে সোলাইমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, “আমরা থানায় আসি, যাতে সহজে সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। কিন্তু এখানে এসে কেউ কেউ তাদের নিজস্ব আইনজীবীর কাছে আমাদের কোর্টে যাওয়ার জন্য চাপ দেন।”
জাহিদ নামে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, থানায় অভিযোগ করার জন্য কম্পিউটার দোকানে গিয়ে তিনি অভিযোগটি লেখাচ্ছিলেন। লেখা শেষ হওয়ার পরপরই দুই-তিনজন ব্যক্তি দোকানে এসে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার সমস্যার বিষয়ে জানতে চান এবং ভিডিও ধারণ শুরু করেন।
তিনি বলেন, “আমরা তো থানায় অভিযোগ করতে এসেছি, সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দিতে আসিনি। আমার অনুমতি ছাড়াই সেই ভিডিও বিভিন্ন ইউটিউব ও ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। পরে ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি দেখিয়ে আমাকে ফোন করে টাকা দাবি করা হয়।”
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন সিদ্দিক সরকার নামে আরেক ব্যক্তি। তার দাবি, কম্পিউটার দোকানে অভিযোগ লেখানোর সময় কয়েকজন নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার ভিডিও ধারণ করেন। পরে ভিডিওটি বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়। এরপর সেটি নিয়ে তাকে ফোন করে টাকা দাবি করা হয়।
সোহাগ নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, থানায় অভিযোগ করার পরদিন কয়েকজন সাংবাদিক পরিচয়ে তার বাড়িতে যান। তারা আগের দিনের অভিযোগের বিষয় উল্লেখ করে সংবাদ সংগ্রহের কথা জানান। এতে তিনি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন তোলেন, “আমি তো তাদের কাউকে বিষয়টি জানাইনি। তাহলে আমার অভিযোগের খবর তারা কীভাবে পেল?”
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, অভিযোগকারী ও বিবাদী উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। এ জন্য নিজেদের অফিস বা নির্দিষ্ট স্থানে যেতে বলা হয়। মধ্যস্থতার নামে অর্থ দাবির অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, সাধারণ মানুষ আইনগত সহায়তার জন্য আইনজীবী বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর পরামর্শ নিতেই পারেন। তবে ব্যক্তিগত অভিযোগের তথ্য কীভাবে বাইরে যাচ্ছে, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন কি না এবং পুলিশের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার দোকানদাররা বলেন, তাদের দোকান থেকে কারও অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য বাইরে দেওয়া হয় না। অনৈতিকভাবে অর্থ আদায়ের সঙ্গেও তারা জড়িত নন।
এ বিষয়ে রায়পুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, থানার নাম ব্যবহার করে কেউ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
থানার সামনে কোনো দালালচক্রের তৎপরতা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে ওসি প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের প্রমাণসহ থানায় অভিযোগ করার অনুরোধ করেন।
সাধারণ মানুষের অভিযোগের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।