• সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১১:৫০ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
শহীদ সন্তানের স্মৃতিতে নিরব ঈদ, রায়পুরে কাঁদছে ফয়েজের পরিবার রায়পুরে সপ্তর্ষি কালচারাল একাডেমীর পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত রায়পুর উন্নয়ন ফোরামের কার্যালয় উদ্বোধন ও ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত লক্ষ্মীপুরে দলীয় নেতা-কর্মীদের ভালোবাসায় সিক্ত হলেন এমপি বিথীকা জমি নিয়ে বিরোধের জেরে কিল-ঘুষিতে বৃদ্ধের মৃত্যু অসহায় বাবার মেয়ের বিয়েতে আর্থিক সহায়তা দিল রায়পুর পৌর ১নং ওয়ার্ড যুব সংগঠন জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রায়পুরে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল ঈদ-উল-আযহা উপলক্ষে রায়পুর উপজেলা ও পৌর প্রবাসী প্রাক্তন ছাত্রদলের শুভেচ্ছা বিনিময় ও দায়িত্ব হস্তান্তর সালিশ না মেনে হামলা, ভাঙচুর-দখলচেষ্টার অভিযোগ প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন: চরপাতায় চাঁদপুর-রায়পুর মহাসড়ক অবরোধ, পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক

শহীদ সন্তানের স্মৃতিতে নিরব ঈদ, রায়পুরে কাঁদছে ফয়েজের পরিবার

medianewsbd / ০ Time View
Update : সোমবার, ১ জুন, ২০২৬

ঈদ মানেই আনন্দ, প্রিয়জনদের ঘরে ফেরা আর পরিবারের সঙ্গে সুখ ভাগাভাগি। কিন্তু লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ঝাউডুগী গ্রামের একটি পরিবারে ঈদ আসে শুধুই দীর্ঘশ্বাস হয়ে। ঈদের দিনেও বাড়ির উঠানে বসে একমাত্র ছেলের স্মৃতিচারণ করেন বৃদ্ধ বাবা-মা। বারবার চোখ চলে যায় বাড়ির প্রবেশপথের দিকে—যদি একবারের জন্যও ফিরে আসে তাদের আদরের সন্তান। কিন্তু সেই অপেক্ষা আর কখনো শেষ হওয়ার নয়। কারণ তাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান মো. ফয়েজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন।

জানা যায়, ২০২৪ সালের ২১ জুলাই রাজধানীর সাইনবোর্ড এলাকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদাত বরণ করেন রায়পুর উপজেলার ঝাউডুগী গ্রামের আলাউদ্দিন বেপারী ও ছবুরা খাতুন দম্পতির ছেলে মো. ফয়েজ। তার মৃত্যুর পর থেকেই পরিবারটির জীবনে নেমে এসেছে শোক, কষ্ট ও অনিশ্চয়তা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ফয়েজ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী সদস্য। তার আয়েই চলত বৃদ্ধ মা-বাবাসহ পরিবারের সকল খরচ। প্রতিবছর ঈদুল আজহায় পরিবারের পক্ষ থেকে কোরবানির ব্যবস্থাও করতেন তিনি। কিন্তু তার মৃত্যুর পর আর্থিক সংকটের কারণে গত তিন বছর ধরে কোরবানি দেওয়া সম্ভব হয়নি। ছেলের শূন্যতার সঙ্গে অর্থকষ্টও এখন পরিবারটির নিত্যসঙ্গী।

ফয়েজের বাবা আলাউদ্দিন বেপারী বলেন, “আমার ছেলে ছিল আমার সবকিছু। সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। প্রতিবছর নিজের টাকায় কোরবানি দিত। বয়সের ভারে আমি কাজ করতে পারি না। ছেলেটা বেঁচে থাকলে আজ আমাদের এত কষ্ট করতে হতো না। ঈদ এলেই ওর কথা বেশি মনে পড়ে। মানুষের ঘরে আনন্দ, আর আমাদের ঘরে শুধু ছেলের শোক।”

পরিবার জানায়, জীবিকার তাগিদে একসময় বিদেশে গিয়েছিলেন ফয়েজ। তবে দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসেন। বিদেশ যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণের বোঝাও তাকে বহন করতে হয়েছিল। পরে তার মৃত্যুর পর সরকার থেকে পাওয়া আর্থিক সহায়তার একটি অংশ দিয়ে সেই ঋণ পরিশোধ করা হয়।

পরিবারের দাবি, শহীদ ফয়েজের মৃত্যুর পর সরকার থেকে ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে তার স্ত্রী ২০ লাখ টাকা নিয়ে আলাদা হয়ে যান। বাকি ১০ লাখ টাকা বিদেশযাত্রার ঋণ ও অন্যান্য দেনা পরিশোধে ব্যয় করা হয়। বর্তমানে পরিবারটির হাতে কোনো উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় নেই।

এদিকে সন্তান হারানোর শোক এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন মা ছবুরা খাতুন। ছেলের কথা উঠলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “ঈদে সবার সন্তান বাড়িতে আসে, মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটায়। কিন্তু আমার ফয়েজ আর আসে না। আমি এখনো দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি। মনে হয়, এই বুঝি আমার ছেলে এসে ‘মা’ বলে ডাকবে। কিন্তু সে তো আর কখনো ফিরবে না। মানুষের ঘরে ঈদের আনন্দ, আর আমার ঘরে শুধু কান্না।”

তিনি আরও বলেন, “আমার ছেলে আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছে। সংসারের জন্য নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়েছে। আজ সে নেই। ঈদ এলেই বুকটা ফেটে যায়।”

শুধু আর্থিক সংকট নয়, শহীদ ফয়েজের কবর নিয়েও রয়েছে পরিবারের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। নিজস্ব কবরস্থানের জায়গা না থাকায় তাকে অন্যের জমিতে দাফন করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসনের কাছে একাধিকবার আবেদন করেও কবরের চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। ফলে কবরটি বর্তমানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, চলতি ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পাঁচ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন তারা। তবে বিএনপি ও এনসিপির পক্ষ থেকে কোনো খোঁজখবর বা সহযোগিতা পাননি বলে দাবি করেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মালেক বলেন, “ফয়েজ দেশের জন্য, মানুষের অধিকারের জন্য জীবন দিয়েছেন। কিন্তু তার পরিবার আজও কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। আমরা চাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হোক। অন্তত শহীদের পরিবার যেন সম্মান ও নিরাপত্তার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে।”

আরেক বাসিন্দা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “ফয়েজের বাবা-মায়ের অবস্থা খুবই করুণ। ছেলেকে হারানোর শোক তারা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ঈদের সময় তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যায়। সমাজের বিত্তবান মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠনের উচিত এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো।”

ঈদের তৃতীয় দিনেও ঝাউডুগীর সেই ছোট্ট বাড়িতে নেই কোনো উৎসবের আমেজ। নেই কোরবানির ব্যস্ততা, নেই ছেলের হাতে কেনা ঈদের আয়োজন। আছে শুধু এক শহীদ সন্তানের স্মৃতি আর তাকে ঘিরে বাবা-মায়ের অশ্রুসিক্ত অপেক্ষা।

পরিবার ও এলাকাবাসীর দাবি, শহীদ ফয়েজের আত্মত্যাগ যেন বিস্মৃত না হয়। তার কবর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক এবং পরিবারটির মর্যাদা, নিরাপত্তা ও জীবনযাপনের নিশ্চয়তায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হোক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category