লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের পানির ঘাট থেকে ধানুর খেওয়া ঘাট পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার মাটির রাস্তা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মাণ করে দিয়েছেন স্থানীয় কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সিদ্দিক সরকার। দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকটে থাকা চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের দাবি, রাস্তা নির্মাণের শুরুতে এলাকাবাসী নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ হাজার টাকা দিতে পেরেছেন। বাকি বড় একটি অংশের অর্থ সিদ্দিক সরকার নিজেই বহন করেছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য তিনি নিজের জমি ও গরু বিক্রি করে রাস্তা নির্মাণের অর্থ জোগাড় করেছেন।
এলাকাবাসী জানান, আগে পানির ঘাট থেকে ধানুর খেওয়া ঘাট পর্যন্ত চলাচলের জন্য কোনো সড়ক ছিল না। বর্ষাকালে পুরো এলাকা কাদা-পানিতে ডুবে যেত। নারী, শিশু, বয়স্ক মানুষ ও কৃষকদের হাঁটুসমান পানি ও কাদা পেরিয়ে চলাচল করতে হতো। অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে কাদা-পানি পার হতে হতো।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তেন কৃষকেরা। চরাঞ্চলের কয়েক হাজার একর জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন হলেও সেগুলো বাড়িতে আনা কিংবা বাজারে নিয়ে বিক্রি করা ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। বর্ষাকালে যোগাযোগব্যবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত।
এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘প্রথমে সবাই বলেছিল, যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, সবাই কিছু কিছু টাকা দেব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭৫ হাজার টাকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। রাস্তা নির্মাণে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বড় অংশের টাকা সিদ্দিক সরকার দিয়েছেন। তাঁর সহযোগিতা ছাড়া এই রাস্তা আমাদের জন্য স্বপ্নই থেকে যেত।’
আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আগে এই চর দিয়ে হাঁটতে অনেক কষ্ট হতো। বর্ষার সময় কাদা-পানির মধ্যে দিয়ে চলাচল করতে হতো। এখন রাস্তা হওয়ায় চলাচলে অনেক সুবিধা হয়েছে। তবে আমরা চাই, সরকার দ্রুত রাস্তাটি পাকা করে দিক।’
চরের এক নারী বাসিন্দা বলেন, ‘বৃষ্টি হলে আগে ঘর থেকে বের হওয়াই কঠিন ছিল। নারী ও শিশুদের নিয়ে চলাচলে অনেক সমস্যা হতো। এখন রাস্তা হওয়ায় আমরা অনেকটা স্বস্তি পেয়েছি। রাস্তাটি পাকা হলে আমাদের কষ্ট আরও কমবে।’
এক কৃষক বলেন, ‘চরে আমরা কয়েক হাজার একর জমিতে ফসল করি। কিন্তু ফসল বাড়িতে আনা বা বাজারে নেওয়ার জন্য রাস্তা ছিল না। সিদ্দিক সরকার নিজের জায়গা-জমি ও গরু বিক্রি করে মানুষের জন্য রাস্তা করেছেন। এখন সরকারের কাছে আমাদের দাবি, রাস্তাটি পাকা করে দেওয়া হোক।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্য নিজের অর্থ ব্যয় করে রাস্তা নির্মাণ করলেও সিদ্দিক সরকারের নিজের বসতঘরের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। তাঁর বাড়িতে ভাঙা বেড়া, মাটির উঠানসহ সাধারণ জীবনযাপনের চিত্র দেখা যায়। এলাকাবাসীর দাবি, নিজের প্রয়োজনের চেয়ে মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই তিনি ব্যক্তিগত সম্পদ ব্যয় করেছেন।
এ বিষয়ে কৃষকদল নেতা সিদ্দিক সরকার বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই মানুষের দাবি ছিল, এই রাস্তাটি করে দেওয়ার। আমি নেতাদের কাছে এবং ইউনিয়ন পরিষদে কয়েকবার যোগাযোগ করেও এক মুঠো মাটিও আনতে পারিনি। চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট আমি কাছ থেকে দেখেছি। বর্ষার সময় কাদা-পানি পেরিয়ে মানুষ চলাচল করতেন, কৃষকেরা ফসল নিয়ে বাড়ি ফিরতে অনেক ভোগান্তিতে পড়তেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি শহীদ জিয়ার আদর্শের কৃষকদল করি। তাই এলাকার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তা করার উদ্যোগ নিই। সবাই যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করার কথা বললেও প্রয়োজন অনুযায়ী কেউ টাকা দিতে পারেননি। তাই নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে মানুষের জন্য কিছু করতে পেরে আমি খুশি।’
তবে সিদ্দিক সরকার জানান, এটি বর্তমানে একটি মাটির রাস্তা। স্থায়ী যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে তিনি সরকারের কাছে রাস্তাটি দ্রুত পাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, চরাঞ্চলের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ফসল উৎপাদন হলেও যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থার কারণে কৃষকদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে কাঁচা রাস্তা দিয়ে কৃষিপণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে পড়ে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, ব্যক্তিগত উদ্যোগে নির্মিত পানির ঘাট থেকে ধানুর খেওয়া ঘাট পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার মাটির রাস্তাটি সরকারি উদ্যোগে দ্রুত সংস্কার ও পাকাকরণ করা হবে। এতে চরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি কৃষিপণ্য পরিবহন ও বাজারজাতকরণও সহজ হবে।